বউ যখন বাপের বাড়ি যায়

 রুবাইয়া চলে যাওয়ার পর আমি আর কিছুতেই কোন কাজে মন বসাতে পারছি না। রাতদিন শুধু তার কথা ভাবতে ভাবতে কেমন যেন শুকিয়ে গেছি! এই তো সেদিন বিকেলে সেলিম চাচার সঙ্গে দেখা! আমাকে দেখে দাঁড় করিয়ে ছড়াৎ করে পানের পিক ফেলে জিজ্ঞেস করলেন; “কি রে বাপ, তোর চোখ-মুখ এমন ফ্যাকাসে হয়া গেছে কেরে? জন্ডিস ফন্ডিস আবার হইলো নাকি? খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতো হচ্ছে তো?”


“জি চাচা!”

“দুপুর বেলা কই খাইচোস?”

“ঝিনু'র হোটেলে!”

“সর্বনাস! বমি কর, বমি কর এখুনি!”

“কেন চাচা!” 

“ওরা যে কুত্তার মাংস দিয়া বিরিয়ানি রান্ধে এইটা তুই জানোস না? যেই-সেই কুত্তা না, ঘাউকাইশ্চা নেরি কুত্তা, লালা পড়ানি বাইন কুত্তা, ফেনা পড়া কাইল্লা কুত্তা। এগুলান কিনতে তো আর টেহা লাগে না! তুই বমি কর এখুনি!”

“আমি তো বিরিয়ানি খাইনি চাচা। পাঙ্গাশ মাছ দিয়ে খেয়েছি!”

“ছ্যা ছ্যা ছ্যা...! আর মাছ পাইলি না! পাঙ্গাশ মাছ যে মাইনসের গু' খাইয়া বড় হয় জানোস না? তার উপর মানিক মিয়ার ডোবা! হালার পুতে তো তিন-চারাটা কাঁচা পায়খানার টাংকি দিয়া মাছ পুষে! দেখোস না, গু খাইয়া খাইয়া মাছগুলান কেমন কলকলাইয়া বাড়োন বাড়ছে!”


চাচার কথা শুনে আমার সত্যি সত্যি বমি আসতে লাগলো! আমি গলা খাঁকারি দিয়ে বললাম-

“জি চাচা। ঠিক বলেছেন! আজ থেকে অন্য হোটেলে খাবো।”


“উহু, এমনে বাইরে খাইলে চলবো? বাইরের খাওন তো সব দুই নম্বর, ভেজাল। ভাইটামিন নাই। শোন, যতদিন বউমা না আসে পরতেক খাওনের আগে তর চাচির কাছে আইবি, কাঁচকলার তরকারি দিবো, কচুর লতি দিবো, হাসের ডিম ভাজি কইরা দিবো। শরম করবি না একদম!”


“আচ্ছা চাচা।”

“আইবি কিন্তু! আজকা রাইতে তোর দাওয়াত থাকলো! টেংরা মাছের ঝোল দিয়া চারডা ডাল-ভাত খাইয়া যাবি।”

“আচ্ছা চাচা। যাবো ইন শা আল্লাহ।”


চাচার কাছে বিদায় নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়িতে চলে এলাম। ধীরে ধীরে রাত নেমে এলো। কিন্তু আমার আর চাচার বাসায় যেতে ইচ্ছে করে না। একা একাই রান্না করে খেতে বসলাম। রাতে রান্নার মেনুও একটাই, ডিম ভাজি আর ভাত! হালকা করে একটু লেবুও চেপে দিয়েছি।


কিন্তু গলা দিয়ে এতটুুকুনও ভাত নামতে চায় না! রুবাইয়ার কথা আবারো মনে পড়ছে। আমরা একই প্লেটে খাবার খাই, মাঝে মাঝে রুবাইয়া আমায় খাইয়ে দেয়! আর আমিও তাকে খাইয়ে দেই। আমি খাইয়ে না দিলে সে কিছুই খেতে চায় না। এমনকি বাদাম, লিচু, কলা সব আমার দাঁড়ায় খাইয়ে নিবে!একদিন তো কলা খাইয়ে দিতে দিতে একটা কবিতাও বলেছিলাম। কি যেন কবিতাটা! ওহ হ্যাঁ মনে পড়েছে -

Islamic cartoon

“এই মেয়েটা পাগলী অনেক 

বুঝতে চায় না কিছু!

আমার কাছেই খাইয়ে নিবে

জাম, কলা, আর লিচু! 

অফিস থেকে আসলে দেরি 

গাল ফুলিয়ে থাকে!

একলা একা থাকলে নাকি 

জ্বীনে-ভূতে ধরে!..”


এখন তো আমিই একলা একা হয়ে আছি! দিন যেন আর এগুতে চায় না! তার শূণ্যতায় হৃদপিণ্ডের তলদেশে নিম্নচাপের মতো হুহু করে ওঠে মন! উঠোনের বারান্দায় ঝুলে থাকা তার হিজাবটা ছুঁয়ে ছুঁয়ে বড়ই করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি তখন। কই! হিজাব থেকে তো আগের মতো আর রজনীগন্ধার সুঘ্রাণ ভেসে আসে না! 


যতোই দিন গড়ায় ততোই অস্থিরতায় ছটফট করতে থাকে বুকের ভেতরটা। বিকেল হলেই ক্লান্ত মলিন শরীরটাকে নিয়ে কোনমতে সিঁড়ি ঠেলে ঠেলে ছাঁদে গিয়ে উঠি। ছাঁদ আমায় প্রবল বেগে কাছে টানে, উপরের আকাশটা যে বড্ড পরিচিত! এই আকাশের নিচে নিয়মিত রুবাইয়া সহ গোধূলির পানে চেয়ে থাকতাম, কবিতা শুনাতাম, নশীদ গাইতাম, কত্ত গল্প করতাম! কতো স্মৃতি যে লেগে আছে এই এতোটুকুন জায়গায়! 


আজ আমার ক্লান্ত শরীর! মনের কোথাও আনন্দ নেই, উল্লাস নেই। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামে, পাখিরা ঝাঁকে ঝাঁকে বাসায় ফিরে যায়। আমার আর বাসায় ফিরতে ইচ্ছে করে না। একলা একা রুমের ভেতর থাকতেও ভীষণ কষ্ট লাগে। শূন্য রুমটার চারদিকে রুবাইয়া রুবাইয়া গন্ধটা আমাকে দুমড়ে মুচড়ে বিদ্ধস্ত করে দেয়। 


মাঝে মাঝে মধ্যরাতে ঘুমের ঘোরে তাকে খুঁজতে থাকি। ডানে বামে হাতড়িয়ে যখন দেখি সে নেই! বুকের বা পাশটা চিনচিন করে উঠে। আচ্ছা কবে সে ফিরবে? আমার কথা কি তার একটুও মনে পড়ে না! সে কি কারো ফোন ম্যানেজ করে অন্তত একটা মিসকল পর্যন্ত দিতে পারে না? নাহ, এভাবে আর অস্থিরতা নিয়ে থাকতে পারবো না। কালকেই ওকে নিয়ে আসবো। 


পরদিন সকাল দশটা বাজতেই সাদা জুব্বাটা গায়ে দিলাম। দাঁড়িতে, বুকে, হাতের আস্তিনে আতর লাগালাম ভালো করে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মিনিট দশেক ধরে পাগড়িটা ঠিক করে নিলাম। 


 এমন সময় হঠাৎ কলিং বেলের শব্দ! 


আমি তড়িঘড়ি করে দৌড়ে গিয়ে দরজার ছিটকিনি খুলে দিলাম। আমায় ভীষণ অবাক করে দিয়ে রুবাইয়া রুমে ঢুকলো! 


আমি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বললাম-


“এতোদিন কেউ বাপের বাড়িতে থাকে? আমি তো তোমাকে নিয়ে আসতে তৈরি হচ্ছিলাম!”


রুবাইয়া হাঁপাতে হাঁপাতে বলল-

“দেরিই হয়ে গেলো একটু। কেন দেরি হলো বলছি। অনেক কথা আছে তোমার সাথে। তার আগে এক গ্লাস পানি নিয়ে আসো তো! রান্নাঘরে গ্লাস রাখা আছে। উফফ! আজ, যা গরম পরেছে না বাইরে!”


রুবাইয়া গরমে কুলকুল করে ঘামছে। আমি ওর ঘামে চিকচিক করা নিটোল চোখ দু'টোর দিকে কিছুক্ষণ অপলকে তাকিয়ে থেকে রান্নাঘরের দিকে গেলাম! আহ...! কি যে ভালো লাগছে, বলে বোঝানো সম্ভব না! আমার পাগলিটা যে আজ বাসায় ফিরেছে!


এরপর রান্না ঘরে ঢুকতেই আলু পটোলের উপর পা পড়ে ধরাস করে পিছলে গেলাম। সঙ্গে সঙ্গে আমার সমস্ত কল্পনা উবে গেল। উবে গেল সেলিম চাচা, পাঙ্গাশ মাছ, রুবাইয়া, এমনকি আমার কবিতাটাও! শুধু আম্মা আমার পিছলে পরা দেখে খিলখিল করে হাসতে লাগলো! তার সাথে ছোটবোন রুকুটাও!


আমি তখন পৃথিবীর সবচেয়ে করুণতম দীর্ঘশ্বাসটি ছেড়ে ফিসফিসে বললাম- 

“বিয়া


তো দেয় না, খালি হাসে! আজ বিয়ে করলে এমন ভাবে পিছলে যেতাম?”

0 মন্তব্য(গুলি)